দেনমোহর কত হওয়া উচিত
দেনমোহর কত হওয়া উচিত?, হাদিসের আলোকে নো-ঘটকের পরামর্শ
বিয়ের সময় দেনমোহর কত ধরা উচিত, এই প্রশ্নটা প্রায় প্রতিটি বাঙালি মুসলিম পরিবারে আসে। কেউ লক্ষ টাকা চান, কেউ লজ্জায় কম বলেন, কেউ বুঝে উঠতে পারেন না কতটা যৌক্তিক।
আজ আমরা এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করব, কোনো মতামত নয়, বরং সরাসরি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম থেকে প্রমাণসহ।
লেখাটা সব মাযহাব ও সব মুসলিম ভাইবোনের জন্য, কারণ এই হাদিসগুলো সবাই মানেন, সবার কাছেই সহীহ।
দেনমোহর কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
দেনমোহর বা "মাহ্র" হলো বিয়ের সময় স্বামী তার স্ত্রীকে যে অর্থ বা সম্পদ দেন, এটা ইসলামের ফরজ বিধান।
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন: "আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহরানা সন্তুষ্ট চিত্তে প্রদান কর।"
মোহরানা স্ত্রীর অধিকার। এটা পরিবারকে দেওয়া পণ নয়, বাবার পাওনা নয়, সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর নিজের সম্পদ।
সহীহ হাদিস কী বলে?
রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর জীবনে দেনমোহরের অনেক উদাহরণ আছে। তিনি নিজে কীভাবে বিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে সাহাবীদের পরামর্শ দিয়েছেন, তাই দেখুন:
- হাদিস ১, সবচেয়ে সহজ দেনমোহর: আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রাঃ)-এর শরীরে হলুদ চিহ্ন দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: "এটা কী?" তিনি বললেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি একজন আনসারী মহিলাকে বিয়ে করেছি।" রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: "তুমি তাকে কী দিয়েছ?" তিনি বললেন: "একটি খেজুরের আঁটির পরিমাণ সোনা।" রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: "বরকতময় হোক। ওয়ালিমা করো, একটি বকরি দিয়ে হলেও।"
- হাদিস ২, লোহার আংটি দিয়ে বিয়ে: সাহল ইবন সাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। একজন সাহাবী রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে এক মহিলাকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে বললেন: "যাও, কিছু খুঁজে আনো, লোহার আংটি হলেও।" তিনি কিছু খুঁজে পেলেন না। রাসূলুল্লাহ ﷺ জিজ্ঞেস করলেন: "তোমার কাছে কুরআনের কী আছে?" তিনি কিছু সূরার নাম বললেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: "আমি তোমাকে এই মহিলার সাথে বিয়ে দিলাম তোমার কাছে যা কুরআন আছে তার ভিত্তিতে।"
- হাদিস ৩, উম্মুল মুমিনীনদের দেনমোহর: আবু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি আয়িশা (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন: "রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর স্ত্রীদের দেনমোহর কত ছিল?" আয়িশা (রাঃ) বললেন: "তাঁর স্ত্রীদের দেনমোহর ছিল ১২ উকিয়া এবং ১ নাশ্, যা মোট সাড়ে ১২ উকিয়া।"
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সেটাই যেটাতে সবচেয়ে কম খরচ হয়।", মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং ২৪৫২৯
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে সেটাই যেটাতে সবচেয়ে কম খরচ হয়।"
আরেক হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "সবচেয়ে কল্যাণময় মাহর সেটাই যেটা সবচেয়ে সহজ।", সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ২১১৭ (সহীহ)
তাহলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কত হওয়া উচিত?
হাদিস থেকে আমরা তিনটি স্তর দেখতে পাই:
- স্তর ১, সর্বনিম্ন (যা সম্ভব): আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রাঃ)-এর মতো, খেজুরের আঁটির পরিমাণ সোনা। আজকের হিসাবে: ৩০-৪০ হাজার টাকার সোনা।
- স্তর ২, মধ্যম (যা বহু সাহাবী দিয়েছেন): উমর (রাঃ) তাঁর মেয়েদের বিয়েতে এর বেশি দেনমোহর ধরতে নিষেধ করেছিলেন। "আদর্শ মাহর" বলতে রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর স্ত্রীদের ৫০০ দিরহাম। আজকের হিসাবে: ১.৫-২ লক্ষ টাকা সমপরিমাণ রূপা।
- স্তর ৩, অধিক (সামর্থ্য থাকলে): ফাতিমা (রাঃ) -কে আলী (রাঃ) দিয়েছিলেন তাঁর বর্ম, যা তখনকার সমাজে যথেষ্ট মূল্যবান ছিল। সামর্থ্যবানদের জন্য বেশি দিতে কোনো বাধা নেই।
নো-ঘটকের পরামর্শ (বাংলাদেশের জন্য বাস্তব হিসাব)
পরিবার ও পাত্রের সামর্থ্য বিবেচনা করে নিচের যে কোনো স্তর বেছে নিন:
- ▶ সাধারণ পরিবার: ৩০,০০০, ১,০০,০০০ টাকা
- ▶ মধ্যবিত্ত পরিবার: ১,০০,০০০, ২,৫০,০০০ টাকা
- ▶ সচ্ছল পরিবার: ২,৫০,০০০, ৫,০০,০০০ টাকা
দেনমোহর নিয়ে যেসব ভুল ধারণা প্রচলিত
ভুল ধারণা ১: "যত বেশি দেনমোহর, তত মর্যাদা"
সত্য: এটা সম্পূর্ণ ভুল। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবীদের অনুসরণ করলে বুঝবেন, কম দেনমোহরে বরকত বেশি।
সতর্কতা
লোক দেখানোর জন্য বড় অংক ধরে পরে পরিশোধ না করা, এটা স্পষ্ট হারাম।
শেষ কথা
দেনমোহর কত হবে, এর কোনো একক উত্তর নেই। সাহাবীদের মধ্যেই বিভিন্নতা ছিল। কেউ অল্প দিয়েছেন, কেউ বেশি দিয়েছেন, সবাই বরকত পেয়েছেন।
মূল কথা তিনটি:
- ১. সামর্থ্য অনুযায়ী ধরুন, পরিশোধযোগ্য পরিমাণ
- ২. সুন্নাহ অনুসরণ করুন, সহজ ও বরকতময় বিয়ে
- ৩. লোক দেখানো বাদ দিন, মর্যাদা টাকায় না, চরিত্রে
আল্লাহ আমাদের সবাইকে বিয়েকে সহজ করার তাওফিক দান করুন। আমাদের যুবকদের বিয়ে সহজ করুন। আমাদের মেয়েদের জন্য আল্লাহভীরু, সম্মানী স্বামী মিলিয়ে দিন।
আমিন。